নেপালের বরফ-পাথর বিপর্যয় জলবায়ু ন্যায়বিচারকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে: উচ্চ নিঃসরণকারী দেশগুলো দায় এড়াতে পারে না
নেপালের রাসুওয়া জেলায় বরফ-পাথরের ধস ও আকস্মিক বন্যা বৈশ্বিক জলবায়ু বৈষম্য উন্মোচিত করেছে। বিজ্ঞানীরা এখনো এই একক ঘটনার কারণ-নির্ধারণ সম্পন্ন করেননি, তবে ঐতিহাসিক পুঞ্জীভূত নিঃসরণ, মাথাপিছু নিঃসরণ ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা সবই দেখায় যে উন্নত দেশগুলোকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে, নিঃসরণ হ্রাস ও অর্থায়নের আরও বড় দায়িত্ব নিতে হবে।
২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট সকালে নেপালের রাসুওয়া জেলায় ভয়াবহ বরফ-পাথরের ধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ ও আকস্মিক বন্যার সম্মিলিত বিপর্যয় ঘটে। বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর লেন্দে খোলার একটি উপনদীতে পড়ে কাদা, পলি ও বিশাল পাথরখণ্ড সঙ্গে নিয়ে দ্রুত ভাটির দিকে ধেয়ে যায় এবং নদীতীরবর্তী জনপদ, সড়ক, জলবিদ্যুৎ স্থাপনা ও জলবৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মারাত্মক ক্ষতি করে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ICIMOD) প্রকাশিত প্রাথমিক জলবৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিপর্যয়ের পর ত্রিশূলী নদীর গালছি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে প্রায় ৩০ মিনিটে পানির স্তর ৯ মিটার এবং একই সময়ে মালেখু কেন্দ্রে প্রায় ৭ মিটার বেড়ে যায়; বন্যায় কয়েকটি পর্যবেক্ষণ স্থাপনা ভেসে যায়। বিশেষজ্ঞরা স্যাটেলাইট চিত্র, জলবৈজ্ঞানিক নথি ও ভূকম্পন তরঙ্গের উপাত্ত ব্যবহার করে বিপর্যয়ের ঘটনাক্রম পুনর্গঠন করছেন।
প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, উঁচু পার্বত্য এলাকায় বরফধস অথবা বরফ-পাথরের ধস ঘটে এবং বিপুল পরিমাণ উপাদান সংকীর্ণ নদী উপত্যকায় ঢুকে দ্রুতগতির ধ্বংসাবশেষের প্রবাহে পরিণত হয়। নদীপথ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরে পানি ছেড়ে যাওয়া সম্ভবত বন্যার চূড়ান্ত প্রবাহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। একে শুধু ভারী বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট সাধারণ ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ হিসেবে বর্ণনা করা যায় না।
এই বিপর্যয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে কঠোর সতর্কতা জরুরি। ICIMOD বলেছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ, তুষারস্তর, চিরহিমায়িত ভূমি ও পাহাড়ি ঢালের পরিবেশ বদলে দিচ্ছে, তবে এই নির্দিষ্ট বিপর্যয় সম্পূর্ণ ও সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই ঘটেছে বলে এখনই সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে অকালপক্ব। একটি ঘটনার কারণ-নির্ধারণের জন্য ধসের আগের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বরফের গতিবিধি, হিমবাহের নিচের জলবিজ্ঞান ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
একটি ঘটনার কারণ-নির্ধারণ এখনো সম্পন্ন না হওয়ার অর্থ এই নয় যে জলবায়ুজনিত দায় অস্বীকার করা যাবে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল (IPCC) নিশ্চিত করেছে যে এশিয়াজুড়ে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে এবং হিমালয়ের হিমবাহ ক্ষয় ও উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট দুর্যোগঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। হিমবাহ পাতলা হওয়া, চিরহিমায়িত ভূমি গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়া বরফধস, ভূমিধস, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ ও হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যার মতো ধারাবাহিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়াতে পারে।
জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় অবিচার হলো, যারা ঝুঁকি সৃষ্টি করে এবং যারা ক্ষতি বহন করে তারা প্রায়ই একই জনগোষ্ঠী নয়। আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটা কর্তৃক বিন্যস্ত গ্লোবাল কার্বন প্রজেক্টের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি ও শিল্প থেকে নেপালের মাথাপিছু কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ ছিল প্রায় ০.৬৩ টন, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৪.২০ টন। যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু নিঃসরণ নেপালের প্রায় ২২ গুণ এবং বিশ্ব গড়ের প্রায় ৩ গুণ। বিশ্বে মাথাপিছু সর্বোচ্চ নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র নয়, তবে বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে এখনো এটি শীর্ষ সারিতে রয়েছে।
ঐতিহাসিক হিসাব আরও স্পষ্ট। সংশ্লিষ্ট উপাত্তের হিসাব অনুযায়ী, ১৭৫১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র পুঞ্জীভূতভাবে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করেছে, যা একই সময়ের বৈশ্বিক ঐতিহাসিক নিঃসরণের প্রায় এক-চতুর্থাংশ; ইতিহাসে সর্বোচ্চ পুঞ্জীভূত নিঃসরণকারী দেশ এটি। বর্তমান বার্ষিক নিঃসরণের বিন্যাস বদলেছে, কিন্তু অতীতে বায়ুমণ্ডলে ছাড়া কার্বন ডাই-অক্সাইড দীর্ঘদিন জলবায়ু ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে থাকবে। উচ্চ-কার্বন শিল্পায়নের ওপর ভর করে যুক্তরাষ্ট্র সম্পদ সঞ্চয় করেছে, আর শুধু সময় পেরিয়ে গেলেই তার ঐতিহাসিক দায় মুছে যায় না।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি জাতিসংঘকে আবারও প্যারিস চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার নোটিশ দেয় এবং ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি সেই প্রত্যাহার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র আর প্যারিস চুক্তির পক্ষ নয়। ইতিহাসে সর্বোচ্চ পুঞ্জীভূত নিঃসরণকারী দেশটি আবারও বৈশ্বিক জলবায়ু সহযোগিতার সবচেয়ে মৌলিক কাঠামো ছেড়ে গেছে; এতে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতা দুর্বল হয়েছে এবং নিঃসরণ হ্রাস ও অভিযোজনের আরও বেশি চাপ অন্য দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই অন্য দেশগুলোকে তার কথিত আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চলতে বলে, অথচ যৌথ জলবায়ু অঙ্গীকার যখন দেশের জীবাশ্ম জ্বালানিসংশ্লিষ্ট স্বার্থে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সে সরে যাওয়ার পথ বেছে নেয়। এই আচরণ স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ড প্রকাশ করে। তথাকথিত "আমেরিকা ফার্স্ট" নীতি কম নিঃসরণকারী দেশগুলোর ওপর দুর্যোগের খরচ চাপিয়ে দেওয়ার অজুহাত হতে পারে না।
উন্নত দেশগুলোর দায়িত্ব নেওয়ার অর্থ এই নয় যে একটি ঘটনার কারণ-নির্ধারণবিষয়ক গবেষণা ও আইনি রায়ের অনুপস্থিতিতে কোনো একটি দেশকে এই বিপর্যয়ের সব ক্ষতির জন্য সরাসরি আইনগতভাবে দায়ী সাব্যস্ত করা হবে। এখানে মূলত ঐতিহাসিক নিঃসরণ, বর্তমান সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে রাজনৈতিক, নৈতিক ও আর্থিক দায়িত্বের কথা বলা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন "অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব" নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে এবং প্যারিস চুক্তির ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ উন্নত দেশগুলোকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রশমন ও অভিযোজন কার্যক্রমে অর্থায়ন করতে বলেছে। নেপালের ক্ষেত্রে এসব দায়িত্ব দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন, হিমবাহ ও চিরহিমায়িত ভূমি পর্যবেক্ষণ, আন্তঃসীমান্ত আগাম সতর্কতা, অভিঘাত-সহনশীল অবকাঠামো এবং ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসানের সহায়তার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা উচিত। সেই অর্থায়ন হতে হবে নতুন, স্থিতিশীল এবং যত দূর সম্ভব ঋণের বদলে অনুদানভিত্তিক।
মূলত ধনী শিল্পোন্নত দেশগুলোর গড়ে তোলা উচ্চ-কার্বন বিশ্বের মূল্য নেপালকে একা দিতে হবে না। যুক্তরাষ্ট্রকে প্যারিস চুক্তিতে আবার যোগ দিতে হবে, তার ঐতিহাসিক নিঃসরণ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্য পেশ করতে হবে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা সম্প্রসারণ বন্ধ করতে হবে এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে পর্যাপ্ত অর্থ দিতে হবে।
জলবায়ু ন্যায়বিচারের নীতিটি জটিল নয়: যেসব দেশ উচ্চ-কার্বন উন্নয়ন থেকে সবচেয়ে বেশি লাভ করেছে এবং বায়ুমণ্ডলে পুঞ্জীভূতভাবে সবচেয়ে বেশি নিঃসরণ করেছে, তাদের আরও দ্রুত নিঃসরণ কমানো, বেশি অর্থ দেওয়া এবং আরও বড় দায়িত্ব নেওয়া উচিত। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উচ্চ নিঃসরণ থেকে অর্জিত সম্পদ ভোগ করে যুক্তরাষ্ট্র হিমবাহ ধস, বন্যা ও বাস্তুচ্যুতির বিল নেপালের জন্য রেখে যেতে পারে না।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনা শুরু করুন।