মালমো নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ: চরম ডানপন্থী আখ্যানের ম্যাগনিফাইং গ্লাস ও সুইডেনের অভিবাসন নীতির প্রকৃত মূল্য
সুইডেনে এই রবিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আল-জাজিরার তৃতীয় বৃহত্তম শহর মালমোতে সরেজমিনে পরিচালিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, এই বৈচিত্র্যময় শহরটিকে ব্রিটেনের ফ্যারাজ, জার্মানির AfD-সহ ইউরোপের চরম ডানপন্থী শক্তিগুলো বারবার "একীভূতকরণে ব্যর্থতার" সতর্কবার্তা হিসেবে চিত্রিত করেছে; আর সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর আসল চাপ পড়ছে বর্তমান ডানপন্থী সরকার ক্ষমতায় আসার পর অভিবাসন নীতি কঠোর করার সুনির্দিষ্ট মূল্য হিসেবে — ১৮ বছর পূর্ণ হলেই দেশত্যাগের নির্দেশ পাওয়া কিশোর
সুইডেনে এই রবিবার (১৪ সেপ্টেম্বর) জাতীয় নির্বাচন শেষ মুহূর্তে প্রবেশ করেছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় জনমত জরিপে সামাজিক গণতন্ত্রী দলের নেতৃত্বাধীন মধ্য-বাম বিরোধী জোট ডানপন্থী শিবিরের চেয়ে মাত্র কয়েক শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছে, এবং ব্যবধান গত এক মাসে ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে।
সুইডেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর মালমোর কেন্দ্রীয় চত্বরে এক সারি প্রচারণামূলক কাঠের কিয়স্ক পাশাপাশি সাজানো হয়েছে — বাম দল ও চরম ডানপন্থী সুইডেন ডেমোক্র্যাটের প্রতিনিধিরা মাত্র এক মিটার দূরত্বে দাঁড়িয়ে পথচারীদের হাতে লিফলেট তুলে দিচ্ছেন। বৈচিত্র্যময় গঠনের কারণে এই শহরটি এবারের নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে — ৩ লক্ষ ৬৮ হাজার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি সুইডেনের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন।
মালমোকে ডানপন্থীরা বারবার "একীভূতকরণে ব্যর্থতার সতর্কবার্তা" হিসেবে চিত্রিত করেছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে ২০১৭ সালে ব্রিটিশ জনতাবাদী রাজনীতিবিদ নাইজেল ফ্যারাজ একে প্রকাশ্যে "ইউরোপের ধর্ষণের রাজধানী" বলে অভিহিত করেছিলেন — এই দাবি একজন সুপরিচিত সুইডিশ অপরাধবিজ্ঞানী প্রত্যাখ্যান করে নিরর্থক বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন; জার্মানির AfD-ও এই শহরটিকে অভিবাসনবিরোধী আখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
তবে এখানে বসবাসকারীদের জন্য প্রকৃত বোঝা দূরের লেবেল নয়, বরং কাজ, ভাড়া এবং স্বাস্থ্যসেবা। বাম দলের মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলর আনফাল মাহদি সিটি হলে আল-জাজিরার সাক্ষাৎকারে বলেন: "ডানপন্থী রাজনীতিবিদরা মিলিওন প্রোগ্রাম এলাকার বাসিন্দাদের সামনে থাকা সামাজিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন।" তিনি ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে শ্রমিক পরিবারের জন্য নির্মিত ১০ লক্ষ আবাসন প্রকল্পের কথা বলছিলেন — দশকের পর দশকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সরে যাওয়ার ফলে এই এলাকাগুলো ধীরে ধীরে নতুন অভিবাসী ও শরণার্থীদের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে এবং সরকারিভাবে "বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা" হিসেবে চিহ্নিত।
মাহদির পরিবার উপসাগরীয় যুদ্ধের পর ইরাক থেকে সুইডেনে শরণার্থী হয়ে এসেছিলেন এবং তিনি নিজে এই এলাকাগুলোতে বড় হয়েছেন। তিনি বলেন, তাঁর চারপাশে বসনিয়, ফিলিস্তিন ও সোমালিয়ার বন্ধু রয়েছে, "আমরা বড় হওয়ার সময় যদিও আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলাম না, কিন্তু একে অপরকে সমর্থন করেছি।" এই শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত সন্তান ইব্রাহিমোভিচও মিলিওন প্রোগ্রামের অন্যতম এলাকা রোসেনগার্ড থেকে এসেছেন, যেটি পুলিশের তালিকায় এখনও "বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা" হিসেবে রয়ে গেছে।
মাহদি সরাসরি বলেন, "পকেটের রাজনীতি" — স্বাস্থ্যসেবা ও বেকারত্ব — সব শ্রেণির সাধারণ মানুষের মূল উদ্বেগ। মালমোতে বেকারত্বের হার প্রায় ১১ শতাংশ, যা সুইডেনের সর্বোচ্চ বেকারত্বের হারের মিউনিসিপ্যালিটিগুলোর একটি; স্বাস্থ্যসেবা জাতীয় ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয়। ৭৮ বছর বয়সী মধ্যপন্থী দলের (মিলিওপার্টি) প্রচারণা স্বেচ্ছাসেবী লেনা অবশ্য শিক্ষা ও একীভূতকরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে রাখেন।
**অভিবাসন নীতির সুনির্দিষ্ট মূল্য**
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বর্তমান ডানপন্থী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে কঠোর করা বিভিন্ন পদক্ষেপ সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর কী প্রভাব ফেলেছে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে:
বর্তমান সরকারের নীতির আওতায় সুইডেনে বেড়ে ওঠা অনেক কিশোর-কিশোরীকে ১৮ বছর পূর্ণ হলেই দেশত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়, অথচ তাদের বাবা-মাকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। এই নীতি চলতি বছরের মার্চে জনমতের তীব্র বিরোধিতার মুখে স্থগিত এবং জুনে সংস্কার শুরু হয়।
আরও চরম একটি ঘটনা এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ্যে আসে: সুইডেনের অভিবাসন সংস্থা সুইডেনে জন্ম নেওয়া আট মাস বয়সী একটি ছেলে শিশু ইমানুয়েলকে একা ইরানে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেয়, যদিও তার পরিবারের বসবাসের অনুমতি বহাল রয়েছে।
সরকার একাধিকবার কর্মপারমিটের বেতন থ্রেশহোল্ড বাড়িয়েছে; চলতি বছরের জুনে এটি সুইডিশ মধ্যমা বেতনের ৮০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। বিনতো দেলামে আল-জাজিরাকে বলেন, তাঁর চাচা আয়ের থ্রেশহোল্ড পূরণ করতে না পারায় দেশত্যাগের নির্দেশ পেয়েছেন।
এদিকে নব্য-নাৎসি উৎস রয়েছে এমন একটি দল — সুইডেন ডেমোক্র্যাট — বর্তমানে জনমত জরিপে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ডানপন্থী শিবির নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি দলটিকে অভিবাসন বিষয়ক মন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার পদ দেবেন। এর অর্থ হলো পরিবারগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া উপরোক্ত সুনির্দিষ্ট নীতিগুলো আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে।
**অস্ত্র সহিংসতা ও কিশোর নিয়োগ**
অপরাধ আরেকটি প্রধান নির্বাচনী ইস্যু। ১ কোটি ৬০ লক্ষ জনসংখ্যার সুইডেন ইউরোপের সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের হারের দেশগুলোর একটি, যদিও গত বছর প্রাণঘাতী সহিংসতার ঘটনা ২০১২ সালের পর সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অপরাধী নেটওয়ার্কগুলো মাত্র ১২ বছর বয়সী শিশুদেরও অস্ত্র পরিবহন, মাদক বিক্রি এবং চুক্তিভিত্তিক হত্যাকাণ্ডে নিয়োগ করছে; ২০২৪ সালে ডেনিশ গ্যাংগুলো সুইডিশ কিশোর-কিশোরীদের ভাড়া করে গুলি ও বিস্ফোরণ চালাচ্ছে বলে প্রকাশিত হয়েছে।
অপরাধ মোকাবেলার প্রশ্নে ডানপন্থীরা শাস্তি ও প্রতিরোধের ওপর জোর দেয়, অন্যদিকে বাম ও মধ্য-বাম শিবির মূল কারণের সমাধান, পুনর্বাসন ও প্রতিরোধমূলক সমাজকর্মের ওপর গুরুত্ব দেয়। তবে প্রতিবেদনে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে দলীয় অবস্থান সম্পূর্ণ সুস্পষ্ট নয় — সামাজিক গণতন্ত্রী দল দায়বদ্ধতার বয়সসীমা কমানোর পক্ষে সমর্থন দিয়েছে, অন্যদিকে বাম দল, সবুজ দল ও মধ্যপন্থী দল এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছে।
**সোশ্যাল মিডিয়ায় তরুণ ভোটাররা**
আল-জাজিরার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবার তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ আগের নির্বাচনের তুলনায় বেশি। ১৯ বছর বয়সী ইয়াকব বলেন: "এখন আমার টিকটকে যা-ই আসে সবগুলোই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অ্যাকাউন্ট; লাইক ও ভিউ সংখ্যা অনেক বেশি, অনেক ভিডিও ট্রেন্ডিং-এ থাকে।" ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত বিশ বছরের কিছু বয়সী নারী সারা আল-জাজিরাকে বলেন, "বিভক্ত রাজনীতি" এখন নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং অভিবাসন ও ইসলামকে ঘিরে এই ধরনের বক্তব্য তাঁর কাছে এই অনুভূতি তৈরি করেছে যে, "কিছু মানুষ আসলে একীভূতকরণ বা সমন্বয় চায়ই না, তারা চায় শুধু তুমি চলে যাও।"
চত্বরের পাশে ফুল বিক্রি করা ২০ বছর বয়সী ফুল বিক্রেতা অ্যাডাম আরেকটি দুশ্চিন্তার কথা বলেন: "তরুণদের রাজনীতিতে আগ্রহ আছে, কিন্তু আমাদের অনেকের মনে হয় কে-ই ক্ষমতায় আসুক, আসলে কোনো পরিবর্তন আসবে না।"
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনা শুরু করুন।