ক্ষমতা ও রাজনীতি

মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ 'আনুগত্যের' অজুহাতে কোটি মানুষকে জনগণনা থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব: উচ্চ অভিবাসী রাজ্য হারাবে আসন ও অনুদান

মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ এই সপ্তাহে একটি স্মারকলিপি প্রকাশ করে ২০৩০ সালের জনগণনায় শুধুমাত্র নাগরিক ও গ্রিন কার্ডধারীদের গণনার প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে আনুমানিক ১৬০ লক্ষ অবৈধ অভিবাসী ও বৈধ কিন্তু অস্থায়ী বাসিন্দাদের বাদ দেওয়া হবে। সমালোচকরা বলছেন, এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ সরাসরি সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর 'সমস্ত বাসিন্দার সংখ্যা' শর্তকে আঘাত করবে এবং উচ্চ অভিবাসী রাজ্যগুলোতে ফেডারেল অনুদান সংকুচিত হওয়া, প্রতিনিধি পরিষদের আসন ও নির্বাচক মণ্ডলীর ভোট পুনর্বণ্টনের রাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে।

1 বার দেখা হয়েছেসংরক্ষণ করতে প্রবেশ করুন
TRUTH ERA

আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ এই সপ্তাহে একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপি প্রকাশ করেছে, যেখানে ২০৩০ সালের জাতীয় জনগণনায় শুধুমাত্র মার্কিন নাগরিক ও স্থায়ী বাসিন্দাদের গণনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং অবৈধ অভিবাসী ও গ্রিন কার্ডবিহীন বৈধ অস্থায়ী বাসিন্দাদের সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বাণিজ্য বিভাগের যুক্তি হলো, এই ব্যক্তিরা 'প্রকৃত বাসিন্দা' নন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের পর্যাপ্ত 'যোগসূত্র ও আনুগত্য' নেই। এই প্রস্তাবে একই সঙ্গে ১৭৯০ সাল থেকে প্রশ্নাবলিতে অন্তর্ভুক্ত কিছু জাতি ও জনগোষ্ঠী-সংক্রান্ত প্রশ্ন এবং একটি যৌন অভিমুখ-সংক্রান্ত প্রশ্ন বাদ দেওয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে; বর্তমানে এটি ৩০ দিনের জনসাধারণের মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ১৪০ লক্ষ অবৈধ অভিবাসী এবং কমপক্ষে ২০ লক্ষ বৈধ কিন্তু স্থায়ী পরিচয়হীন অভিবাসী রয়েছেন; এই প্রস্তাব অনুযায়ী এই ১৬০ লক্ষেরও বেশি মানুষ জনগণনায় গণনা করা হবে না। আল জাজিরা পিউয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, অর্ধেকের বেশি অবৈধ অভিবাসী ছয়টি রাজ্যে — ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি ও ইলিনয় — কেন্দ্রীভূত, যেখানে ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ২৩ লক্ষ এবং টেক্সাসে প্রায় ২১ লক্ষ। অর্থাৎ, প্রস্তাবটির সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়বে ফেডারেল রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি ওজন বহনকারী রাজ্যগুলোর ওপরই।

যুক্তরাষ্ট্রের জনগণনা ব্যুরো নিজেই স্বীকার করেছে যে জনগণনার তথ্য প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল অনুদানের প্রবাহ নির্ধারণ করে, যা স্কুল, হাসপাতাল ও জনসাধারণের অবকাঠামো পর্যন্ত বিস্তৃত। নাগরিক অধিকার সংগঠন 'সিভিল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস লিডারশিপ কনফারেন্স'-এর জনগণনা ও তথ্য ন্যায়পূর্ণতা প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ পরিচালক মিতা আনন্দ রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই পরিবর্তনের প্রভাবকে 'যুগান্তকারী' বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, জনগণনার তথ্য 'আমাদের গণতন্ত্র ও সমাজকে এতটাই ধারণ করে রেখেছে' যে একবার বিকৃত হলে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ ভুল ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।

গভীরতর আঘাত এসে পড়ে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের আসন বণ্টন ও নির্বাচনী এলাকা ভাগ — উভয়ই জনগণনার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে, এবং নির্বাচক মণ্ডলীর ভোটও তাই। উচ্চ অবৈধ অভিবাসী জনসংখ্যার এলাকাগুলো তাই প্রতিনিধিত্ব সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে; কোনো রাজ্য যদি এ কারণে প্রতিনিধি পরিষদের একটি আসন হারায়, তাহলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নির্ধারণকারী নির্বাচক মণ্ডলীতেও তার সেই কণ্ঠস্বর খুইয়ে যাবে।

এই প্রস্তাব আইনি ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছে। নিউ ইয়র্কের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে বলেছেন: 'সংবিধান স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রত্যেক ব্যক্তি, তাঁর অভিবাসন অবস্থা যাই হোক না কেন, জনগণনায় গণনা করতে হবে।' তিনি জানান, তাঁর কার্যালয় প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। সমালোচকরা মার্কিন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী উদ্ধৃত করে বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বণ্টন প্রতিটি রাজ্যে 'সমস্ত ব্যক্তির সংখ্যা' (the whole number of persons in each State)-এর ভিত্তিতে হওয়া উচিত; প্রশাসনিক স্মারকলিপি 'আনুগত্য'-কে মানদণ্ড করে গণনার বিষয়বস্তু নির্বাচন করার মাধ্যমে আসলে প্রশাসনিক হাতে সংবিধানের পাঠ পুনর্লিখন করছে। উদারপন্থী নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর আমেরিকান প্রোগ্রেস এই প্রস্তাবকে 'আমাদের গণতন্ত্রের ওপর নগ্ন আক্রমণ, যার উদ্দেশ্য নির্বাচনী মানচিত্রকে ছাঁচে ফেলা ও বৈচিত্র্যময় মার্কিন সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে ক্ষীণ করা' বলে চিহ্নিত করেছে এবং নাগরিকদের নিজ নিজ রাজ্যের প্রতিনিধিদের কাছে এর বিরোধিতা করে আবেদন জানানোর আহ্বান জানিয়েছে।

লক্ষণীয় যে, প্রস্তাবটি কোনো বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়, বরং এটি ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন দমন ও নির্বাচনী এলাকা পুনর্চিত্রাংকনের বিস্তৃত আক্রমণের অংশ, যেখানে ডাকযোগে ভোটদানের ওপর বিধিনিষেধসহ এমন একাধিক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত যেগুলোকে কর্মীরা সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করার সম্ভাব্য হাতিয়ার বলে উল্লেখ করেছেন। আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পদক্ষেপগুলো একত্রে প্রশাসনিক ও রাজ্য পর্যায়ের দুটি পথেই মার্কিন নির্বাচনী ভূদৃশ্য পুনর্গঠনের লক্ষ্যে পরিচালিত।

সংবিধান অনুযায়ী, জনগণনার ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কংগ্রেসের; প্রশাসনিক স্মারকলিপি কংগ্রেসকে এড়িয়ে বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বড় আইনি অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে; এমনকি চূড়ান্তভাবে আদালতে টিকে গেলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন বর্তমান প্রশাসনের মেয়াদের পরেই সম্ভব। তাই প্রস্তাবটির ভাগ্য একই সঙ্গে জনমত গ্রহণের ফলাফল, ফেডারেল বিচার বিভাগের মনোভাব এবং ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসের রাজনৈতিক গঠনের ওপর নির্ভরশীল। 'কে আমেরিকান এবং কে গণনার যোগ্য' — এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে একটি প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই ইতিমধ্যে টেবিলে এসে গেছে।

মন্তব্য

0

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনা শুরু করুন।