রিয়াদ বিমানবন্দরে আবার হামলা: পশ্চিমা একযোগে নিন্দা, ইয়েমেনের বেসামরিক মৃত্যুতে সর্বসম্মত নীরবতা
রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রবিবার বিকেলে হামলায় কমপক্ষে একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন। হুথি মিলিশিয়া গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি আরবের দুটি বিমানবন্দর ও সৌদি আরামকোর দুটি স্থাপনায় চারটি হামলা চালানোর দাবি করেছে। ট্রাম্প, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতারা দ্রুত একযোগে নিন্দা জানিয়েছেন, কিন্তু একই সময়ে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে ৯১ জন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে—যাদের ৬০ শতাংশ নারী ও শিশু—এই সত্য সরকারগুলোর বিবৃতিতে প্রায় অনুপস্থিত।
সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রবিবারের হামলাটি ঘটেছে যখন বিমানবন্দরটি আগের দিনের প্রাণঘাতী হামলার পর এখনও বন্ধ ছিল। ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, হামলায় কমপক্ষে একজন নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে নিহত ব্যক্তি পাকিস্তানি নাগরিক। সৌদি বেসামরিক বিমান চনাচল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে এটি আগের দিন ১২ জন নিহত ও কয়েকশো আহতের ঘটনার পরের আরেকটি হামলা।
হুথি মিলিশিয়া অবিলম্বে হামলার দায় স্বীকার করে। ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, হুথি মিলিশিয়ার মুখপাত্র জানিয়েছেন সংগঠনটি "গত ২৪ ঘণ্টায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে চারটি উচ্চমানের অভিযান" পরিচালনা করেছে, যার লক্ষ্যবস্তু ছিল রিয়াদ বিমানবন্দর একাধিকবার, পূর্বাঞ্চলের দাম্মাম বিমানবন্দর এবং সৌদি জাতীয় তেল কোম্পানি আরামকোর দুটি স্থাপনা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিমানবন্দরের কাছে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আটকানো হয়েছে, তবে আটকানোর বিস্তারিত এবং আটকানো সম্পূর্ণ সফল হয়েছে কি না তা প্রকাশ করা হয়নি।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে হুথি মিলিশিয়া সামাজিক মাধ্যমে সতর্কতা জারি করে: "আমরা সকল বিমান সংস্থা, বিশেষজ্ঞ, কর্মচারী, শ্রমিক ও যাত্রীদের পুনরায় সতর্ক করছি: সৌদি বিমানবন্দর ও আকাশসীমা ব্যবহার করবেন না, কারণ এই স্থানগুলো হামলার ঝুঁকিপূর্ণ এবং আমাদের বাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।" বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে মক্কা ও মদিনার দুটি পবিত্র নগরীর বিমানবন্দর হামলার পরিধির বাইরে। হুথি মিলিশিয়া পরিচালিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের মাধ্যমে জানিয়েছে: "যদি না সৌদি শত্রু ইয়েমেনে আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপ বন্ধ করে, তাহলে আরও খারাপ পরিস্থিতি আসছে, আল্লাহর ইচ্ছায়," বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে তাদের কর্মকাণ্ড পারস্পরিক নীতি দ্বারা পরিচালিত হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া হামলার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত আকার নিতে শুরু করে। ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শনিবার জানিয়েছেন তিনি সৌদি আরবের প্রকৃত নেতা, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলবেন, হামলাকে "অগ্রহণযোগ্য" বলে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন যুক্তরাষ্ট্র "বিবেচনা করবে" সৌদি আরবের হুথি মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে হামলায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট ফন ডের লায়েন "সৌদি আরবের সঙ্গে একাত্মতা" প্রকাশ করে "বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধির" নিন্দা জানিয়েছেন এবং বলেছেন "ইরানের প্রক্সি এই হামলাগুলো অঞ্চলটিকে সহিংসতার সর্পিলে ঠেলে দিচ্ছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক পরিবহন ও শক্তি কেন্দ্রগুলোকে নাড়িয়ে দিচ্ছে, এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।" জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াডফুল "দৃঢ়ভাবে" সেই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন যাকে তিনি "সৌদি আরব ও বেসামরিক বিমান চলাচলের ওপর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড" হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা সচিব স্ট্রিটিং এটিকে "ঘৃণ্য" হামলা এবং "বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি" বলে অভিহিত করেছেন। ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় "জঘন্য হামলার" নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে "সম্পূর্ণ একাত্মতা" তুলে ধরেছে। ইরানের কৌশলগত অংশীদার রাশিয়াও হুথি মিলিশিয়ার হামলার নিন্দা জানিয়ে "রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে" শত্রুতা সমাপ্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সৌদি রাজধানীতে তার নাগরিকদের জায়গায় থেকে সুরক্ষিত থাকতে আহ্বান জানিয়েছে।
কিন্তু এই একযোগে নিন্দার অন্যদিকে রয়েছে পশ্চিমা সরকারগুলোর ইয়েমেনের বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে পদ্ধতিগত নীরবতা। হুথি মিলিশিয়া পরিচালিত স্বাস্থ্য বিভাগ দাবি করেছে, গত পাঁচ সপ্তাহে সৌদি জোটের বিমান হামলায় ইয়েমেনের ৯১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ডয়চে ভেলে ওই বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী ও শিশু; এই সংখ্যাটি এখন স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একই দিনে আগে ওই বিভাগ জানিয়েছিল, সৌদি সন্দেহভাজন বিমান হামলায় সানায় একটি বেসামরিক বাড়ি লক্ষ্যবস্তু হয়ে একটি শিশু নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। হুথি মিলিশিয়া নিয়ন্ত্রিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশন আরও জানিয়েছে, সৌদি জোট রবিবার বিকেলে সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালিয়েছে, কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তুর উল্লেখ করেনি; সৌদি কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। সৌদি জোট আগের হামলাগুলোকে "পরিপূর্ণ যুদ্ধাপরাধ" বলে চিহ্নিত করেছে।
হামলার উত্তেজনা বৃদ্ধি সরাসরি জোটের সামরিক কর্মকাণ্ডের উত্তেজনা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। হুথি মিলিশিয়া গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূলবর্তী কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো, বিশেষত বাব-এল-মান্দেব প্রণালী এলাকা দখল করার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে ইয়েমেনের সরকারকে পাল্টা আক্রমণে সমর্থন দিয়েছে। ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সিগুলোর একটি হিসেবে হুথি মিলিশিয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে লড়াই করে আসছে; ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি সংঘাত স্থবির করেছিল, কিন্তু একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি অর্জন সম্ভব হয়নি। পশ্চিমা সরকারগুলো রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার নিন্দা দ্রুত ও একসঙ্গে জানিয়েছে, কিন্তু ইয়েমেনে নারী ও শিশুরা বিমান হামলার প্রধান শিকারে পরিণত হওয়ার বাস্তবতায় সর্বসম্মতভাবে নীরব রয়েছে।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনা শুরু করুন।