মার্কিন-ইরান যুদ্ধে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী, পিকঅ্যাক্স পর্বতের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার হুমকি ট্রাম্পের; নতুন বাংকার-বিধ্বংসী বোমার উন্নয়নও ত্বরান্বিত
CSIS-এর ছয় বছরের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে ইরানের পিকঅ্যাক্স পর্বতের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় ২০২৬ সালে নির্মাণকাজ ব্যাপকভাবে বাড়ার প্রমাণ মিলেছে। ট্রাম্প সেখানে হামলার হুমকি দিয়েছেন; একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র গভীর লক্ষ্যবস্তুতে অস্ত্র পরীক্ষার প্রস্তুতি ও MOP-এর বিকল্প বোমা তৈরির কাজ দ্রুত করছে। পাল্টাপাল্টি হামলায় ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে এবং আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে।
দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, সিএনএনের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) ছয় বছরের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার কাছে পিকঅ্যাক্স পর্বতের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ২০২৬ সালে নির্মাণকাজ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্থাপনাটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ কার্যক্রম সুরক্ষিত রাখতে ব্যবহার করা হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো খুব শিগগির পিকঅ্যাক্সে হামলা চালাবে এবং সেখানে প্রত্যেকের গতিবিধি তাদের জানা আছে। ওই স্থানে সংশ্লিষ্ট কোনো তৎপরতা শনাক্ত হলেই যুক্তরাষ্ট্র হামলা করবে বলেও তিনি হুমকি দেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে সিএনএন জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে ওই স্থানে হামলার একটি কার্যকরী পরিকল্পনা রয়েছে; চলতি গ্রীষ্মে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়ানোর হুমকি দেওয়ার সময় সেটি বিকল্প লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ছিল। পরিকল্পনায় মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের কয়েকটি বৃহত্তম বোমা ব্যবহারের কথা রয়েছে। তবে সূত্রগুলো স্বীকার করেছে, ইরান সেখানে কিছু সরিয়ে নিলে তা ধ্বংস করার মতো গভীরতায় এসব অস্ত্র পৌঁছাতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। CSIS দল বলেছে, গ্রানাইটের এই পর্বত পেন্টাগনের সবচেয়ে ভারী অপারমাণবিক বোমার জন্যও কঠিন লক্ষ্য।
হামলার সক্ষমতা গড়তে যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে একাধিক পথে এগোচ্ছে। সিএনএনের প্রকাশ করা চুক্তিপত্রে দেখা যায়, অপারেশন এপিক ফিউরি শুরুর চার দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স থ্রেট রিডাকশন এজেন্সি ১২ লাখ ডলারের একটি জরুরি চুক্তি স্বাক্ষর করে। নিউ মেক্সিকোর হোয়াইট স্যান্ডস মিসাইল রেঞ্জে একটি বিশেষ ভূগর্ভস্থ পরীক্ষাকেন্দ্র মেরামত করে গভীর ভূগর্ভস্থ লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র পরীক্ষা চালানো ছিল এর উদ্দেশ্য। যুদ্ধ শুরুর আগের দিন, ২৭ ফেব্রুয়ারি, নথিগুলো কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে আপলোড করা হয়। সেখানে সময়-সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা নির্দেশনার উল্লেখ করে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে দ্রুত পরীক্ষার প্রস্তুতি শেষ করতে বলা হয়। অবগত তিন ব্যক্তি সিএনএনকে বলেছেন, হোয়াইট স্যান্ডসের পরিকল্পনা ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ইরানের সবচেয়ে গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আঘাত হানার পদ্ধতি উদ্ভাবন এর লক্ষ্য; এর মধ্যে নির্দিষ্ট পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার অনুকরণে মহড়াও থাকতে পারে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ডিফেন্স থ্রেট রিডাকশন এজেন্সি ও মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড পরিচালিত একটি দুর্গম স্থানে ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে। তবে পরীক্ষা সত্যিই হয়েছে কি না বা সেখানে দেখা তৎপরতার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী ছিল, তা সিএনএন স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।
মার্কিন বিমানবাহিনী বর্তমানে ব্যবহৃত ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স পেনিট্রেটর (MOP) বোমার বিকল্প হিসেবে পরবর্তী প্রজন্মের বাংকার-বিধ্বংসী বোমাও তৈরি করছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রোটোটাইপ তৈরির চুক্তি দেওয়া হয়; তার আগে ওই বছরের জুনে প্রতিরক্ষা শিল্পের কাছে অস্ত্রটির সম্ভাব্য সরবরাহকারী চাওয়া হয়েছিল। সমস্যা হলো, ২০২৫ সালের জুনে অপারেশন মিডনাইট হ্যামারের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালালেও একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা আইনপ্রণেতাদের জানান, পেন্টাগনের ধারণা ছিল তাদের MOP বোমা ইসফাহানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে পারবে না, তাই শুধু প্রবেশপথগুলোই মাটিচাপা দেওয়া হয়। এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, ২০২৫ সালে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান সব গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি এবং সংঘাত চলার মধ্যেই ইরান ভূগর্ভস্থ নির্মাণ এগিয়ে নিতে পেরেছে।
পিকঅ্যাক্স পর্বত আবার আন্তর্জাতিক নজরে আসার সময় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধও দ্রুত তীব্র হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন বাহিনী পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার জবাবে ইরান বুধবার হরমুজ প্রণালির কাছে ১০টি জাহাজে হামলার ঘোষণা দেয়। ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে নৌপরিবহনের ওপর এটিই সবচেয়ে বড় পাল্টাপাল্টি হামলা। সংঘাতের প্রভাবে জুলাইয়ের পর প্রথমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা ডিজেলের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৫.৯৪ ডলারের ওপরে ওঠে। জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত একটি ঘাঁটি লক্ষ্য করেও ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে; আগস্টের শেষ ভাগ থেকে দুই দেশ সামরিক, নৌপরিবহন ও জ্বালানি সম্পদে পরস্পরের ওপর হামলা চালিয়ে আসছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর মধ্যে লড়াইও আবার বেড়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের জন্য হুমকি আরও বাড়িয়েছে।
পিকঅ্যাক্স পর্বতের স্থাপনাটি আসলে কী কাজে ব্যবহৃত হবে, সে বিষয়ে CSIS বিশ্লেষকেরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, নির্মাণকাজ এখনো চলার মতো বিষয়গুলো ইঙ্গিত দেয় যে স্থাপনাটির এখনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা নেই, যদি সেটিই এর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত তিনটি কাজের যেকোনো একটির জন্য এটি ব্যবহৃত হতে পারে: সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, অথবা ইউরেনিয়ামকে ধাতুতে রূপান্তরের মতো অন্য পারমাণবিক অস্ত্রসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগে ইঙ্গিত দিয়েছিল, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইরান সেন্ট্রিফিউজ পিকঅ্যাক্স পর্বতে সরিয়ে নিতে পারে। তবে স্থাপনাটির ব্যবহার সম্পর্কে CSIS-এর মূল্যায়ন এখনো অনুমাননির্ভর এবং এ বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দা মহল কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনা শুরু করুন।