বিশ্ব ও নিরাপত্তা

ইউক্রেনে হামলায় ১৫ বেসামরিক নিহত, তিন শিশু; রুশ আর্কটিকে ‘সবচেয়ে গভীর হামলা’র দাবি কিয়েভের

ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, ১০ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার হামলায় অন্তত ১৫ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন; তাদের মধ্যে সুমি শহরের একটি বিপণিবিতানে নিহত তিন শিশু ও ওদেসার কাছে একটি টাগবোটের দুই আজারবাইজানি নাবিক রয়েছেন। একই দিনে ইউক্রেনের বিশেষ বাহিনী রুশ আর্কটিকের দুটি গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাদের “সবচেয়ে গভীর হামলা” চালানোর দাবি করে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ৩৫ কোটি কানাডীয় ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা ও “শতবর্ষী অংশীদারত্ব” ঘোষণা করেছেন।

33 বার দেখা হয়েছেসংরক্ষণ করতে প্রবেশ করুন
TRUTH ERA

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর রুশ বাহিনী ইউক্রেনের একাধিক শহরে হামলা চালায়। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তা ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় অন্তত ১৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৮০ জনের বেশি আহত হন। নিহতদের মধ্যে পাভলোহরাদে চারজন, মিকোলাইভে চারজন, সুমিতে তিনজন, দনিপ্রোতে দুজন এবং ওদেসা অঞ্চলে হামলার শিকার বেসামরিক টাগবোট “TEDY”-তে থাকা দুই আজারবাইজানি নাবিক রয়েছেন।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সুমি শহরে জেটচালিত একটি ড্রোন বিপণিবিতানে আঘাত করলে অন্তত ১৪ জন আহত হন; নিহত তিনজনই শিশু। সুমি আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের প্রধান ওলেহ হ্রিহোরভ Telegram-এ হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেন। দনিপ্রোপেত্রোভস্ক আঞ্চলিক কৌঁসুলির দপ্তর জানায়, পাভলোহরাদের হামলায় আরও ৬০ জনের বেশি আহত এবং বেশ কয়েকটি দোকান ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মিকোলাইভ অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত গভর্নর হেওরহি রেশেতিলভ Telegram-এ বলেন, শহরটিতে রাতের হামলায় দুই পুরুষ ও দুই নারী নিহত এবং অন্তত ১৯ জন আহত হন।

দনিপ্রোতে একটি সূর্যমুখী তেল প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় হামলার বিষয়ে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা এক বিবৃতিতে বলেন, “এটি কোনোভাবেই কাকতালীয় নয়; এটি মার্কিন কোম্পানি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে মস্কোর নিয়মতান্ত্রিক সন্ত্রাসী অভিযানের অংশ।”

হামলার লক্ষ্য সম্পর্কে রাশিয়া ও ইউক্রেনের বর্ণনায় স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, ইউক্রেনের মিকোলাইভে আঘাতের লক্ষ্য ছিল একটি ড্রোন গুদাম; আর চর্নোমর্স্ক বন্দর ও ওদেসার কাছের জাহাজে হামলা চালানো হয় সামরিক সরঞ্জাম বহনে ব্যবহৃত মালবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে। ইউক্রেন এসব হামলাকে বেসামরিক স্থাপনার ওপর আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়েছে সীমিত পরিসরে।

একই সঙ্গে রাশিয়ার ভূখণ্ডে ইউক্রেনের পাল্টা হামলার পরিসরও বেড়েছে। ইউক্রেনের বিশেষ বাহিনী X-এ এক বিবৃতিতে দাবি করে, তারা ইয়ামালো-নেনেতস স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নোভি উরেঙ্গয় ও পুরোভস্কি গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরের এই অভিযান ছিল “পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার ভূখণ্ডের সবচেয়ে গভীরে চালানো হামলা”। ইউক্রেন বলেছে, দুটি কারখানাই রাশিয়ার গ্যাসশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং বছরে কয়েক মিলিয়ন টন গ্যাস কনডেনসেট প্রক্রিয়া করে। নোভি উরেঙ্গয় রুশ আর্কটিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস ও কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র।

তবে হামলার দূরত্ব নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্যে অমিল রয়েছে। রাশিয়ার আঞ্চলিক গভর্নর দিমিত্রি আর্তিউখভ বলেন, ঘটনাস্থল ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ২,৮০০ কিলোমিটার দূরে, ইউক্রেনের দাবি অনুযায়ী তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি নয়। তার ভাষ্য, নোভি উরেঙ্গয়ের একটি শিল্প স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল এবং তা প্রতিহত করা হয়েছে; তবে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন লাগলেও কেউ হতাহত হননি। উরাল অঞ্চলে ক্রেমলিনের প্রতিনিধি আর্তিওম ঝোগা বলেন, এই প্রথম কোনো হামলা ওই অঞ্চলের আর্কটিক অংশে পৌঁছেছে। ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট মাত্রা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সামরিক সহায়তাও বাড়ছে। আল জাজিরার মতে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বৃহস্পতিবার ক্যালগেরিতে সফররত ভলোদিমির জেলেনস্কিকে স্বাগত জানানোর সময় ঘোষণা করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের “Jumpstart mechanism”-এর মাধ্যমে ৩৫ কোটি কানাডীয় ডলার, প্রায় ২৬ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের আকাশ প্রতিরক্ষা প্রতিরোধক সরবরাহ করা হবে। দুই দেশ ড্রোন উৎপাদনে সহযোগিতার একটি চুক্তিও স্বাক্ষর করে। জেলেনস্কির সঙ্গে আরেকটি চুক্তি সইয়ের পর কার্নি বলেন, কানাডা ও ইউক্রেন একটি “শতবর্ষী অংশীদারত্ব” গড়ে তুলতে কাজ করবে এবং “কানাডা চিরকাল আপনাদের পাশে থাকবে”। জেলেনস্কি চুক্তিগুলোকে “গুরুত্বপূর্ণ” বলে অভিহিত করে বলেন, এগুলো ইউক্রেনের “আকাশ” রক্ষায় সহায়তা করবে।

কানাডা যখন সহায়তা ঘোষণা করছে, তখন ইউক্রেনের বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার পরিসরও বাড়ছে। ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সেরহি কোলেতস্কি একই দিনে সতর্ক করেন যে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বেসামরিক স্থাপনায় রুশ হামলা “দ্রুত বাড়ছে”; তিনি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অতিরিক্ত সহায়তার ঘোষণাও দেন। কানাডার “শতবর্ষী অংশীদারত্ব” কাঠামো বর্তমান আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা ও ড্রোন উৎপাদনক্ষমতাকে এক শতাব্দীব্যাপী অঙ্গীকারের মধ্যে যুক্ত করছে। এমন সময়ে এই অঙ্গীকার এসেছে, যখন ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ঘাটতি অব্যাহত এবং বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।

জেলেনস্কি বৃহস্পতিবার বলেন, ২০ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার আগে যুদ্ধ শেষ করা নিয়ে কোনো ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হবে না। তিনি জানান, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকেরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন; সেপ্টেম্বরের শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর জ্বালানি ও খাদ্য রপ্তানি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশা করেন। চলতি মাসের শুরুতে জেলেনস্কি বলেছিলেন, ইউক্রেনীয় ড্রোন যুদ্ধজুড়ে রাশিয়ার আকাশসীমাকে “সম্পূর্ণ অনিরাপদ” করে তুলবে। আর্কটিক বৃত্তের ভেতরের গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে হামলা সেই বক্তব্যকে রাশিয়ার কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রপ্তানি পশ্চাৎভূমি পর্যন্ত প্রসারিত করেছে।

মন্তব্য

0

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনা শুরু করুন।

ইউক্রেনে হামলায় ১৫ বেসামরিক নিহত, তিন শিশু; রুশ আর্কটিকে ‘সবচেয়ে গভীর হামলা’র দাবি কিয়েভের | Truth Era