সংরক্ষণের নামে: African Parks-এর ক্ষমতা, আদিবাসীদের অভিযোগ ও অপ্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদন
প্রিন্স হ্যারি শিগগিরই African Parks-এর পরিচালনা পর্ষদ ছাড়ছেন। তবে বড় প্রশ্নটি হলো, আফ্রিকার ১৩টি দেশে দুই কোটি হেক্টরের বেশি জমি পরিচালনাকারী এই এনজিওর কমিশন করা গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার তদন্ত কেন কখনো প্রকাশ করা হয়নি এবং স্থানীয় আদিবাসীদের ওপর এর সশস্ত্র রেঞ্জারদের সহিংসতার অভিযোগের যথাযথ জবাব এখনো কেন মেলেনি।
প্রিন্স হ্যারি শিগগিরই African Parks-এর পরিচালনা পর্ষদ ছাড়ছেন—এই খবরের আড়ালে আরও গভীর একটি প্রশ্ন সামনে আসছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় সদর দপ্তর থাকা এই বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা চুক্তির মাধ্যমে আফ্রিকার ১৩টি দেশে দুই কোটি হেক্টরের বেশি সংরক্ষিত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। এর সশস্ত্র রেঞ্জারদের বিরুদ্ধে স্থানীয় আদিবাসীদের মারধর, নির্যাতন, এমনকি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। অথচ সত্য উদঘাটনের কথা ছিল যে গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদনের, সেটি দুই বছর ধরে নথির আলমারিতে বন্ধ এবং কখনোই প্রকাশ করা হয়নি।
Deutsche Welle-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে African Parks নিয়ে অনুসন্ধান করা ডাচ সাংবাদিক অলিভিয়ের ফান বেমেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, রাজপরিবারের সদস্য ও সংস্থাটি এখন “একে অন্যের জন্য বরং বোঝা” হয়ে উঠেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিষয়টি কোনো তরুণ রাজপরিবারের সদস্যের আনুষ্ঠানিক ফিতা কাটার মঞ্চ থেকে সরে যাওয়ার চেয়ে অনেক বড়।
African Parks-এর কার্যক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে “অর্পিত ব্যবস্থাপনা” মডেল: আফ্রিকান দেশগুলো সংরক্ষিত এলাকার দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার অধিকার সংস্থাটির হাতে তুলে দেয়। আইনত জমি রাষ্ট্রেরই থাকে, কিন্তু পরিবেশ সংরক্ষণ, অবকাঠামো, পর্যটন পরিচালনা থেকে শুরু করে চোরাশিকারবিরোধী অভিযান পর্যন্ত বিস্তৃত দায়িত্ব সংস্থাটি গ্রহণ করে। কিছু অঞ্চলে এর প্রভাব সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত বিস্তৃত। সংস্থাটি বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা পরিচালনাধীন পার্কের সংখ্যা ৩০টিতে উন্নীত করতে চায়।
“পার্কগুলোর ভেতরে বলপ্রয়োগের ওপর রাষ্ট্রের একচেটিয়া অধিকার তারা নিজেদের হাতে নিয়েছে,” ফান বেমেন Deutsche Welle-কে বলেন। কিছু সমালোচক এই কাঠামোকে “রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র” হিসেবে বর্ণনা করেন। প্রয়োজন হলে প্রায় কোনো সীমা ছাড়াই কঠোর পদ্ধতি ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে সংস্থাটির সশস্ত্র রেঞ্জারদের। এই ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংরক্ষণ কার্যক্রম ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত জমতে থেকেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলো কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের ওদজালা-কোকুয়া জাতীয় উদ্যানকে কেন্দ্র করে। ২০২৩ সালে স্থানীয় আদিবাসী বাকা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা African Parks-এর রেঞ্জারদের হাতে সহিংসতা, নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা জানান। এরপর সংস্থাটি লন্ডনের আইন সংস্থা Omnia Strategy-কে অভ্যন্তরীণ তদন্তের দায়িত্ব দেয়। দুই বছর পর African Parks স্বীকার করে যে “কিছু মানবাধিকার লঙ্ঘন” ঘটেছিল। কিন্তু ফান বেমেনের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন কখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি; তার জানা মতে, সংস্থাটির সঙ্গে পরিচালনা চুক্তি করা কঙ্গো সরকারের কাছেও এটি দেখানো হয়নি।
ওদজালা-কোকুয়ার ঘটনাগুলোর সুনির্দিষ্ট বিবরণ এবং কতজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। African Parks সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে এবং নিজেদের ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকার কথা স্বীকার করেছে। তবে পুরো কেলেঙ্কারিতে সংস্থাটি “অত্যন্ত অস্বচ্ছ” ছিল বলে ফান বেমেন সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে African Parks তার বর্ণনা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। সংস্থাটি বলেছে, তার বইয়ে “শত শত তথ্যগত ভুল” এবং সমসংখ্যক “গুরুতরভাবে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য” রয়েছে। ফান বেমেন বর্ণিত কিছু লঙ্ঘন তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার বাইরে ঘটেছে বলেও তারা জোর দিয়েছে।
African Parks একই সঙ্গে দাবি করে যে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাদের শূন্য-সহনশীলতার নীতি ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ফান বেমেন আফ্রিকার একাধিক দেশে কয়েকজন সাবেক রেঞ্জার এবং সংরক্ষণ কার্যক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সেখানে তিনি বারবার একটি কেন্দ্রীয় সমস্যার মুখোমুখি হন: সংস্থাটি “চোরাশিকার”-এর সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত করেছে। শুধু পরিবারের খাবারের জন্য শিকার করা কিছু স্থানীয় বাসিন্দাকেও আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত পেশাদার চোরাশিকারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। জাম্বিয়ায় সাবেক রেঞ্জাররা তাকে বলেছেন, চোরাশিকারের অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের “মারধর, সম্ভবত অত্যন্ত গুরুতর নির্যাতনের” মুখোমুখি হতে হয়।
সংস্থাটির আদর্শিক ভিত্তিও বিতর্কিত। ডাচ ব্যবসায়ী পল ফেন্তেনার ফান ফ্লিসিঙ্গেন African Parks প্রতিষ্ঠা করেন। ফান বেমেন তার বইয়ে লিখেছেন, প্রতিষ্ঠাতা আফ্রিকানদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করতেন না বলে জানা যায় এবং ১৯৮০-এর দশকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানান। প্রতিষ্ঠাতার ঘনিষ্ঠ এক সাবেক ব্যবসায়িক অংশীদার ফান বেমেনকে বলেন, শীর্ষ পর্যায়ে আফ্রিকানদের নাকি নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতাহীন বলে দেখা হতো। প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে African Parks-এর সদর দপ্তর ছিল নেদারল্যান্ডসে। ফান বেমেনের বর্ণনায়, সেখানকার কর্মীরা প্রায়ই আফ্রিকার মানচিত্র মেলে ধরে পরবর্তী কোন সংরক্ষিত এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেবে তা পরিকল্পনা করতেন।
“কয়েক শতাব্দী আগে একই মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে ঔপনিবেশিক সম্প্রসারণের সুযোগ খোঁজা উপনিবেশবাদীদের কথা মনে না করা আমার জন্য কঠিন,” ফান বেমেন Deutsche Welle-কে বলেন। African Parks এই বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জোর দিয়ে বলেছে যে আফ্রিকান সরকারগুলোর সঙ্গে তাদের বহু চুক্তি “সদিচ্ছা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে” স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এই কেলেঙ্কারির প্রভাব শুধু আফ্রিকা মহাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। প্রিন্স হ্যারির সরে যাওয়ার পাশাপাশি African Parks-সংশ্লিষ্ট সংরক্ষণ প্রকল্পগুলোতে ইউরোপীয় ও জার্মান অর্থও যাচ্ছে। সংস্থাটি বলছে, এই অর্থায়ন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সহযোগিতা সম্ভব করে এবং তাদের পরিচালিত এলাকার ৬৪ শতাংশে স্থানীয় মানুষ বসবাস করেন, আর ৯০ শতাংশ পার্কে আইনসম্মতভাবে সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে ফান বেমেনের মতে, যথেষ্ট পর্যালোচনা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা ছাড়া এসব দাবি যাচাই করা অসম্ভব। বাকা জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরার কথা ছিল যে প্রতিবেদনটির, সেটি এখনো কঙ্গো সরকার, ইউরোপীয় অর্থদাতা ও জনসাধারণের জন্য বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনা শুরু করুন।