মার্কিন-ইসরায়েল ইরানে যুদ্ধ শুরু করল, যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু জ্বালানির খরচ কমাতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করল
আল জাযিরা ইংরেজি চ্যানেলের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়; ফলে তেলের দাম বাড়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির খরচে চাপ বাড়ে। ভোক্তাদের অসন্তোশ ও ৩ নভেম্বরের মধ্যবিৎমান নির্বাচন ঘনিয়ে আসার পটভূমিতে ওয়াশিংটন রাশিয়ার জ্বালানি-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা শিথিল করে এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে। আল জাযিরা রিপোর্টে রয়েটার্সের হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার সবচেয়ে বড় একটি তেল-করের আয়
আল জাযিরা ইংরেজি চ্যানেলের রিপোর্ট অনুযায়ী, মার্কিন অর্থমন্ত্রী ডিপার্টমেন্ট মার্চ থেকে ছাড়পত্র দেওয়া শুরু করে, যার ফলে ইতিমধ্যে জাহাজে বোঝানো রাশিয়ান তেল বিক্রি করা যায়; রিপোর্টের মাসে অর্থমন্ত্রী ডিপার্টমেন্ট রাশিয়ান ডিজেলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দেয়, যার মেয়াদ ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। এরপর ট্রাম্প সদ্য অনুমোদিত রাশিয়া এবং তার তেল-গ্যাস ক্রেতাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেন। এই ব্যবস্থাগুলো নেওয়া হয়েছে মার্কিন-ইসরায়েলের ইরানে যুদ্ধ শুরুর পটভূমিতে: ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যুদ্ধ শুরু করে, এরপর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। আল জাযিরার রিপোর্টে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনও প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই করছে।
শান্তকালে বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চাশ ভাগ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। আল জাযিরার রিপোর্টে বলা হয়েছে, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় ৭২ ডলার থেকে মার্চ ও এপ্রিলে সর্বোচ্চ প্রায় ১২০ ডলারে উঠেছে এবং রিপোর্টের সময়ও ১০৯ ডলারের ওপরে রয়েছে। আল জাযিরা রিপোর্টে রয়েটার্সের হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার সবচেয়ে বড় একটি তেল-করের আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, কারণ গাল্ফ থেকে সরবরাহ পেতে না পারা ক্রেতারা অন্য উৎসে ফিরে গেছেন।
আল জাযিরার রিপোর্ট অনুযায়ী, ওয়াশিংটন দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির খরচ কমাতে রাশিয়ার জ্বালানি-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা শিথিল করেছে; জ্বালানির খরচ যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের প্রধান অভিযোগগুলোর একটি, আর ৩ নভেম্বরের মধ্যবিৎমান নির্বাচনও ঘনিয়ে আসছে। ট্রাম্প বলেন, তিনি রাশিয়াকে ‘বোকামোট করে আবার দরকারাময় টেবিলে ফিরিয়ে আনতে’ চান না, যাতে ইউক্রেন বিষয়ে আলোচনা প্রভাবিত না হয়। নতুন নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার বিরুদ্ধে রিপাবলিকান পক্ষের ভেতরে মূল নিষেধাজ্ঞা বিল সমর্থনকারীদের তীব্র অসন্তোশও দেখা দিয়েছে।
রাশিয়ার ক্ষেত্রেও লাভ সুস্পষ্ট। চ্যাটাম হাউস ইনস্টিটিউটের জন লোক মনে করেন, উচ্চ তেলের দাম ও ডিজেল সরবরাহের চাপ ট্রাম্পকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে এবং রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডিজেল সরবরাহের অনুমতি দিতে বাধ্য করেছে, যা সামগ্রিকভাবে মস্কোর জন্য উপকারী। তিনি আরও বলেন: ‘ক্রেমলিন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউক্রেন-সংক্রান্ত স্বার্থকে একরকম করার চেষ্টা করছে, যাতে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে আর আক্রমণ চালিয়ে যেতে না পারে।’ নিকিতা স্মাগিনের মতে, রাশিয়া যুদ্ধ চলতে থাকার কিছু সুবিধা পেলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির অনির্ধারিত উত্থান চায় না।
রাশিয়া একই সঙ্গে ইরানকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে, তবে প্রকাশ্যে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করেনি। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরোভ তেহরানে ইরানকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেন; রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন-ইসরায়েলের তথ্যকথিত ‘অবৈধ আগ্রাসনকে’ নিন্দা করে। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলো গোয়েন্দা-রিপোর্ট উদ্ধৃত করে জানায়, রাশিয়া ও চীন ইরানকে উপগ্রহচিত্র এবং অস্ত্রের অংশ সরবরাহ করেছে; ট্রাম্প সংশ্লিষ্ট রিপোর্টগুলো অস্বীকার করেন, তাই এই তথ্যগুলোকে নিশ্চিত হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
রাশিয়া একই সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করছে। আল জাযিরার রিপোর্ট অনুযায়ী, ৯ অক্টোবর পুতিন ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় ইরানের যুদ্ধ শেষ করা সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ট্রাম্পের কাছে পৌঁছে দেন। এর আগে ক্রেমলিন জানিয়েছিল, ট্রাম্প ও পুতিন ১১ নভেম্বরে শেনঝেনে অ্যাপাক শীর্ষ সম্মেলন চলাকালীন সময়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা করে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেছেন; তবে শ্বাইট হাউস এখনও নিশ্চিত করেনি যে ট্রাম্প সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন কি না। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক নাদের হাশমি মনে করেন না যে, ট্রাম্প পুতিনের সহায়তা চেয়ে ইরান যুদ্ধ সমাধানের চেষ্টা করছেন; তবে তাঁর সন্দেহ, সম্ভাব্য ত্রিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে ইরান যুদ্ধও আলোচনার বিষয় হতে পারে। এটি এখনও অনুমান।
গাল্ফ সম্প্রদায়ের সদস্যরা লাভরোভকে মস্কোর প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনে’ অংশ নিতে এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধার করতে উৎসাহিত করেছেন। একই সঙ্গে ইরান বাহাইন, কুয়েত, ওমান, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অভ্যন্তরে মার্কিন সামরিক সম্পদ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আক্রমণ চালিয়েছে। রাশিয়া প্রকাশ্যে যুদ্ধে অংশ নেয়নি, তবে সব পক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ রেখে, রাশিয়ান জ্বালানি রপ্তানি বাড়িয়ে এবং নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি পেয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তে নমনীয়তার পরিসর বাড়িয়েছে।
আল জাযিরার রিপোর্টের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনও হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই করছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবিৎমান নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। ট্রাম্প হুমকি দেন, ‘এটি শীঘ্রই শেষ করব’; ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগ্চি সাড়া দেন: ‘আমাদেরও অসমাপ্ত কাজ আছে।’ যুদ্ধ শেষ হয়নি, তবে নিষেধাজ্ঞা ও জ্বালানি নীতি ইতিমধ্যেই নতুন পথে চলে গেছে: তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ক্রেতাদের অন্য উৎসে স্থানান্তরের কারণে রাশিয়ার তেল-করের আয় বাড়িয়েছে, ডিজেল সরবরাহের চাপ ওয়াশিংটনকে সীমাবদ্ধতা শিথিল করতে বাধ্য করেছে; আর মার্কিন-রাশিয়া ইউক্রেন বা ইরানের সমস্যায় কোনো চুক্তি গড়ে তুলতে পারবে কি না, তা নিয়ে বর্তমানে প্রকাশিত তথ্যে কোনো নিশ্চিত পরিকল্পনা নেই।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনা শুরু করুন।