নিষেধাজ্ঞার যুদ্ধে সংস্কৃতিকে জড়ানো: রাশিয়া থেকে গ্যোটে ইনস্টিটিউটের প্রস্থান এবং জার্মানি-রাশিয়া সংঘাতে সাধারণ মানুষের মূল্য
লাইপজিগ বিমানবন্দর ড্রোন ঘটনার জেরে স্বাধীনভাবে প্রমাণিত না হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে জার্মানি রাশিয়া হাউস বন্ধ করে; এর প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া দেশটিতে গ্যোটে ইনস্টিটিউটের তিনটি শাখাই বন্ধ করছে। জার্মান ভাষার শিক্ষক থেকে শুরু করে জার্মান বংশোদ্ভূত প্রত্যাবর্তনকারীরা পর্যন্ত সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক সংঘাতের মূল্য দিচ্ছেন, আর পারস্পরিকতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১১ সালের দ্বিপক্ষীয় সাংস্কৃতিক চুক্তি একতরফাভাবে ভেঙে পড়েছে।
২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাশিয়ায় গ্যোটে ইনস্টিটিউটের তিনটি শাখাই তাদের কার্যক্রম বন্ধ করবে। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্যোটে ইনস্টিটিউটের মহাসচিব গিটে জখ (Gitte Zschoch) এই সপ্তাহের মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সব কর্মীকে রাশিয়ায় কাজ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রাশিয়ায় গ্রন্থাগারের বই ধার দেওয়া এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিও বন্ধ হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় এটি সর্বশেষ সংযোজন। ডয়চে ভেল জানায়, বার্লিনে রাশিয়া হাউস এবং বন-এ রাশিয়ার কনস্যুলেট জেনারেল বন্ধ করার জার্মান সিদ্ধান্তের জবাবে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ ও নোভোসিবিরস্কে জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। উত্তেজনার সূত্রপাত আগস্টের শুরুতে লাইপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা থেকে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে জার্মান কর্তৃপক্ষ মস্কোকে হামলার পরিকল্পনার জন্য দায়ী করে এবং সেই ভিত্তিতে রাশিয়া হাউস বন্ধ ও রুশ নাগরিকদের ভিসা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কঠোর করার ঘোষণা দেয়।
ভেঙে পড়া আইনি কাঠামো
২০১১ সালের রুশ-জার্মান আন্তঃসরকারি দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে বলা হয়েছিল, পারস্পরিকতার নীতির ভিত্তিতে দুই দেশ একে অপরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর পরিচালনার শর্ত নিশ্চিত করবে। তবে ডয়চে ভেলউল্লেখ করে করে যে, এক পক্ষ নিজের দেশের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ করলে অন্য পক্ষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমতুল্য পদক্ষেপে তা বন্ধ করতেই হবে, এমন কথা চুক্তিতে নেই। অর্থাৎ গ্যোটে ইনস্টিটিউটের শাখাগুলো বন্ধের রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ চুক্তির স্পষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সূত্রপাত হয়েছিল জার্মানির আগে চুক্তির কাঠামো ভেঙে ফেলা এবং এখনও গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এক যুক্তির ভিত্তিতে।
জখ তাঁর বিবৃতিতে লিখেছেন: “জার্মান ভাষার শিক্ষকরা পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হারাচ্ছেন। রাশিয়ার মানুষের জন্য এর ফলে জার্মান ভাষা, জার্মান সংস্কৃতি এবং জার্মানি থেকে আসা নির্ভরযোগ্য তথ্যের নাগাল আরও সীমিত হয়ে পড়ছে।”
শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রত্যাবর্তনকারী: সংঘাতের মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ
গ্যোটে ইনস্টিটিউট বন্ধ হয়ে যাওয়া তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে কী প্রভাব ফেলেছে, তা জানাতে ডয়চে ভেল তার রুশ পাঠকদের কাছে মতামত চেয়েছে। ডয়চে ভেল জোর দিয়ে বলেছে, পাঠকদের প্রতিক্রিয়া কোনো প্রতিনিধিত্বশীল জরিপ নয় এবং সব অংশগ্রহণকারীর পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, রুশ কর্তৃপক্ষ ডয়চে ভেলকে “অবাঞ্ছিত সংগঠন” হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে এবং রাশিয়ায় এর সঙ্গে সহযোগিতা করা অপরাধ। এই প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত কণ্ঠগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
মস্কো অঞ্চলের এক জার্মান ভাষার শিক্ষক গণমাধ্যমটিকে জানান, তাঁর স্কুল ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে গ্যোটে ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কাজ করছে: “এই অংশীদারিত্ব আমাদের কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ইনস্টিটিউট আমাদের উচ্চমানের শিক্ষাসামগ্রী এবং সমকালীন জার্মান জীবনের পরিচয় বহনকারী প্রকাশনা দেয়, ফলে ক্লাসগুলো আকর্ষণীয় ও সময়োপযোগী থাকে। আমাদের শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত কোর্স করে, এবং তাদের অনেকেই গ্যোটে সার্টিফিকেট পরীক্ষায় সফল হয়েছে।”
আরেক শিক্ষক সরাসরি বলেছেন: “আমি রাশিয়ায় জার্মান পড়াই, কিন্তু আর চাকরি খুঁজে পাচ্ছি না।” অন্য একজন লিখেছেন: “আমি জার্মান ভাষার শিক্ষক; পেশাগতভাবে নিজেকে পরিত্যক্ত ও দিশাহীন মনে হচ্ছে।”
ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বন্ধের ফলে জার্মান বংশোদ্ভূত প্রত্যাবর্তনকারীরা, যাদের “লেট রিপ্যাট্রিয়েট” বলা হয়, বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। জার্মানিতে চলে যাওয়া এক পাঠক জানান, তাঁর বাবা-মা এ বছর শরৎ বা শীতে গ্যোটে ইনস্টিটিউটে পরীক্ষা দিয়ে তারপর প্রত্যাবর্তন ও বসবাসের নথি জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। এখন তাঁদের তৃতীয় কোনো দেশে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। তিনি বলেন, “এর অর্থ তাঁদের অতিরিক্ত চাপ ও খরচ বহন করতে হবে।” জার্মান স্কুলে পড়া এবং জার্মানিতে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকা এক সন্তানের এক অভিভাবকও বলেছেন: “আমাদের অন্য দেশে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হবে।”
চাহিদা রয়ে গেছে, কিন্তু পরিসর সংকুচিত হচ্ছে
ডয়চে ভেল উদ্ধৃত গ্যোটে ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিধিনিষেধ বাড়লেও রাশিয়ায় ইনস্টিটিউটটির সেবার চাহিদা এখনও প্রবল। ২০২৫ সালে গ্যোটে ইনস্টিটিউটের কর্মসূচি ও অংশীদারদের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার মানুষ জার্মান ভাষা শিখেছেন; ২০২৩ সালের আগে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ হাজার। ওই বছর প্রায় ২২ হাজার পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং গ্রন্থাগারে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬,৭০০। বিশ্বের ১০০টি দেশে গ্যোটে ইনস্টিটিউটের ১৫৪টি শাখা রয়েছে। রাশিয়ার তিনটি শাখা এই নেটওয়ার্ক থেকে হারিয়ে যাবে। তবে ২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের পর পরীক্ষা, ভাষা কোর্স ও শিক্ষা কর্মসূচি অন্য কোনোভাবে বা অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চলবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে ডয়চে ভেল জানিয়েছে।
উত্তেজনা বাড়ার দায় কার?
ডয়চে ভেল যে প্রতিক্রিয়াগুলো পেয়েছে, তাতে রুশ পাঠকদের মধ্যে দায় কার তা নিয়ে মতভেদ দেখা গেছে। এক পাঠকের মতে, রাশিয়া হাউস বন্ধ করার জার্মান সিদ্ধান্তের “যৌক্তিক জবাব” হলো মস্কোর পদক্ষেপ। তিনি বলেন, “সাংস্কৃতিক ও মানবিক বন্ধন রাজনীতির দর-কষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠছে, যা দুঃখজনক।” অন্য পাঠকেরা স্পষ্টভাবে উত্তেজনা বাড়ার জন্য জার্মান পক্ষকে দায়ী করেছেন: “রাশিয়া হাউস বন্ধ করে জার্মান কর্তৃপক্ষ রাশিয়ার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সহযোগিতাকে কবর দিয়েছে। সম্পূর্ণ দায় জার্মানির।”
আরও অনেক পাঠক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর অন্তর্নিহিত যুক্তির দিকে আঙুল তুলেছেন। একজন লিখেছেন: “আমরা চাই রুশ ফেডারেশন ও জার্মানির সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ধ্বংস না হোক। সংস্কৃতি যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বলি হয়েছে, তা বেদনাদায়ক। গ্যোটে ইনস্টিটিউট বন্ধের প্রভাব পড়বে সেই সাধারণ মানুষের ওপর, যারা রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন না।” আরেকজন প্রশ্ন করেছেন: “যারা রাশিয়াকে ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন, তাঁরা কীভাবে একই সঙ্গে নিজেদের সন্তান ও নিকট আত্মীয়দের ইউরোপে শিক্ষা নিতে এবং ইউরোপীয় জীবনযাত্রার সুবিধা ভোগ করতে দিতে পারেন?”
গ্যোটে ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট গেশে ইয়োস্ট (Gesche Joost) রাশিয়ার শাখাগুলো বন্ধ হওয়াকে “জার্মানি-রাশিয়ার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের একটি যুগের সমাপ্তি” বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু এই সমাপ্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে: লাইপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার জন্য জার্মানি মস্কোকে দায়ী করলেও রুশ পক্ষ সত্যিই হামলাটি পরিকল্পনা করেছিল কি না, তা আজও স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। স্বাধীন প্রমাণের অনুপস্থিতিতেই সাধারণ মানুষের জীবন বদলে দেওয়া একের পর এক নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা-নিষেধাজ্ঞা চালু হয়েছে। এর মূল্য দিচ্ছেন সেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রত্যাবর্তনকারীরা, যারা ডয়চে ভেলের আহ্বানে ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেছেন এবং শিক্ষাসামগ্রী, পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ ও পেশাগত দিশা হারাচ্ছেন।
এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনা শুরু করুন।