ক্ষমতা ও রাজনীতি

দলীয় সীমারেখা পেরোনো ভোটারদের চাপ: জীবনযাত্রার ব্যয়, “অন্তহীন যুদ্ধ” এবং যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলের প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া প্রায় ৯ শতাংশ ভোটার গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী মামদানিকে ভোট দিয়েছেন। ভোটারদের ক্ষোভ জীবনযাত্রার ব্যয় ও “অন্তহীন যুদ্ধ” বন্ধের দাবিতে কেন্দ্রীভূত, আর ট্রাম্প আমলে নির্বাচনী সীমানা পুনর্বিন্যাস প্রতিযোগিতার পরিসর আরও সংকুচিত করেছে।

1 বার দেখা হয়েছেসংরক্ষণ করতে প্রবেশ করুন
TRUTH ERA

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কের ভোটার রন বারবা ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে পরের বছর মামদানিকে ভোট দেন। ৫৬ বছর বয়সী নিবন্ধিত রিপাবলিকান বলেন, “Both of them were awesome.” তিনি “MAGA for Mamdani” লেখা লাল টি-শার্ট পরে মামদানির প্রচার সমাবেশে যান। নিজের ব্যবসায়িক সাফল্যের কথাও জানিয়ে তিনি বলেন, এমন শত শত টি-শার্ট ও টুপি বিক্রি হয়েছে এবং অর্ডার নিউইয়র্কের বাইরেও গেছে।

নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া প্রায় ৯ শতাংশ ভোটার ২০২৫ সালের মেয়র নির্বাচনে মামদানির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ২০২৫ সালের শুরুতে এমারসন কলেজের জরিপে মামদানির সমর্থন ছিল প্রায় ১ শতাংশ; তাঁর উত্থান প্রতিষ্ঠিত দুই দলের বাছাই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

দলীয় সীমারেখা পেরিয়ে ভোট দেওয়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ব্রায়ান শ্যাফনার গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ২০১৬ সালের নির্বাচনে বার্নি স্যান্ডার্স ডেমোক্রেটিক মনোনয়ন না পাওয়ার পর তাঁর প্রায় ১২ শতাংশ সমর্থক দল বদলে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, “A lot of times those people are reacting to economic performance, essentially. And a lot of the time, they are just voting against whoever's in office or voting for the outsider candidate who they think will shake things up.” তিনি মনে করেন, বাইরের প্রার্থী হিসেবে পরিচিতি ভোটারদের এমন প্রার্থীর ওপর নিজেদের মতামত আরোপের সুযোগ দেয়, যার রাজনৈতিক অবস্থান তখনও পুরোপুরি নির্দিষ্ট নয়।

প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের নভেম্বরে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে মামদানির সাক্ষাতের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মামদানি বলেন, ব্রঙ্কস ও কুইন্সের ভোটাররা তাঁকে সমর্থন করার দুটি প্রধান কারণ জানিয়েছিলেন: “One was that they wanted an end to forever wars. They wanted an end to the taxpayer dollars we had funding violations of human rights.” দ্বিতীয় কারণ ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকট মোকাবিলা করা।

এই বক্তব্য দলীয় সীমারেখা পেরোনো ভোটারদের ক্ষোভকে ওয়াশিংটনের দুই দলের কয়েক দশকের সামরিক হস্তক্ষেপের দিকে সরাসরি নির্দেশ করে। যে নামেই তা উপস্থাপিত হোক, এর আর্থিক ও মানবাধিকারমূল্য শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমজীবী মানুষ বহন করে। একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী এবং একজন ডানপন্থী জনতাবাদীকে একই ভোটারদের কাছে “বাইরের লোক” মনে হওয়া প্রতিষ্ঠিত দুই দলের রাজনীতির বিরুদ্ধে কঠোর রায়।

গ্যালাপের ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নিজেদের স্বতন্ত্র ভোটার মনে করেন। ১৯৮৮ সালে এই জরিপ শুরু হওয়ার পর এটি সর্বোচ্চ হার; নিজেদের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দেওয়া মানুষের হার প্রায় ২৭ শতাংশ করে। তবে স্বতন্ত্র ভোটারদের প্রায় ২০ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের দিকে এবং ১৫ শতাংশ রিপাবলিকানদের দিকে ঝোঁকেন; প্রকৃত অর্থে দলনিরপেক্ষ ভোটার প্রায় ১০ শতাংশ। ফলে কথিত “আদর্শগতভাবে সীমা পেরোনো” ভোটের ভিত্তি সীমিত।

জীবনযাত্রার ব্যয় দলীয় বিভাজন পেরোনো ভোটারদের সবচেয়ে বড় অভিন্ন উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। গত মাসে প্রকাশিত ইপসসের জরিপে ৪৮ শতাংশ ভোটার এই নির্বাচনী চক্রে জীবনযাত্রার ব্যয়কে “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়” বলেছেন, যা অন্য সব ইস্যুর চেয়ে বেশি। রিপাবলিকান, ডেমোক্র্যাট এবং স্বতন্ত্র পরিচয় দেওয়া সব গোষ্ঠীতেই বিষয়টি প্রথম স্থানে ছিল। রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের রেবোভিচ নিউ জার্সি পলিটিক্যাল ইনস্টিটিউটের পরিচালক মিকা রাসমুসেন বলেন, কিছু ভোটার মনে করেছিলেন ট্রাম্প তাঁদের সাশ্রয়যোগ্যতার সংকট থেকে স্বস্তি দিতে পারবেন, আবার একই কাজের জন্য মামদানিকেও উপযুক্ত মনে করেছিলেন।

সিবিএস নিউজের বুথফেরত জরিপ উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের নিউ জার্সির গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট মিকি শেরিল বড় ব্যবধানে জয়ী হন। ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া লাতিনো ভোটারদের প্রায় ১৮ শতাংশ শেরিলকে ভোট দেন, যেখানে শ্বেতাঙ্গ ট্রাম্প ভোটারদের মধ্যে এই হার ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। নিউইয়র্কের সিবিএস বুথফেরত জরিপে আরও দেখা যায়, হ্যারিসকে ভোট না দিয়ে মামদানিকে ভোট দেওয়া ভোটাররা নিজেদের ডেমোক্র্যাট বা উদারপন্থী হিসেবে কম পরিচয় দেন; তাঁরা তুলনামূলকভাবে তরুণ, এশীয়, লাতিনো ও মুসলিম। এই বহুত্ববাদী জোট টিকবে কি না তা এখনও অনিশ্চিত।

প্রতিবেদন সতর্ক করেছে, মামদানি-ট্রাম্প ভোটারদের এই মিলনকে স্থায়ী নতুন ভোটারগোষ্ঠী ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। এর আকার ও স্থায়িত্ব নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে।

ট্রাম্পের আমলে চালানো নির্বাচনী সীমানা পুনর্বিন্যাসে প্রায় ১০টি রাজ্য এমনভাবে কংগ্রেসীয় আসনের মানচিত্র এঁকেছে, যা নির্দিষ্ট একটি দলের জন্য সুবিধাজনক। প্রতিবেদনের মতে, এর একটি ফল হলো চলতি মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন আগের চক্রগুলোর তুলনায় কমে যাওয়া। অল্পসংখ্যক দোদুল্যমান ভোটার আসনগুলোর নিয়তি ঠিক করবেন, অথচ তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক পছন্দের পরিসর আরও সংকুচিত হচ্ছে।

৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে কি না তা নির্ধারণ করবে। ব্যবধান সামান্য: ডেমোক্র্যাটদের সিনেটে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চারটি এবং প্রতিনিধি পরিষদে তিনটি আসন বাড়াতে হবে। প্রতিষ্ঠানের বিরোধী হিসেবে পরিচিত এক প্রেসিডেন্ট এখন নির্বাচনী সীমানা পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মূল যুক্তিই টিকিয়ে রাখছেন—প্রতিযোগিতা কমানো এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাকাপোক্ত করা। ভোটাররা ব্যালটে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাকে “না” বলছেন, আর একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা আরও সংহত হচ্ছে।

মন্তব্য

0

এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনা শুরু করুন।